আজ আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরব এক বেদনাময় চিত্র। কলম আর ক্যামেরাকে সঙ্গী করে সত্যের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন একজন সাংবাদিক, কিন্তু তাকেই রক্তাক্ত হতে হলো ক্ষমতার দম্ভের কাছে। ১৯শে জুলাই, পটুয়াখালীর মাটিতে যে ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একজন মানুষের আহত হওয়ার খবর নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা আর গণতন্ত্রের উপর এক নির্মম আঘাত।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার খলিশাখালী এলাকা। সেদিন এই জনপদের রাজপথ ছিল ছাত্র-জনতার স্লোগানে উত্তাল। তারা তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে নেমেছিল, আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে এসেছিলেন সংবাদকর্মী লোকমান মৃধা। তার হাতে ছিল শুধু একটি মোবাইল ফোন, যার লেন্স দিয়ে তিনি ধারণ করতে চেয়েছিলেন ইতিহাসের এক খণ্ডচিত্র।
কিন্তু হায়! নিয়তি সেদিন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। যখন তিনি দেখলেন, অসহায় এক ছাত্রকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা নির্মমভাবে প্রহার করছে, তার সাংবাদিক সত্তা নীরব থাকতে পারল না। তিনি দ্রুত তার ক্যামেরা তাক করলেন সেই নৃশংসতার দিকে, আর ঠিক তখনই হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল হামলাকারীরা।
তাদের বর্বরতার শিকার হলেন লোকমান মৃধা। কলম-ক্যামেরার এই সৈনিককে তারা আঘাত করল, তার শরীর থেকে ঝরতে লাগল তাজা রক্ত। চোখের সামনেই সত্যকে গলা টিপে হত্যা করার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। যখন তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, তখন তার পাশে কেউ ছিল না। এই দৃশ্য আমাদের বিবেকে আঘাত করে।
অবশেষে, যখন জেলা পুলিশ ও সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পটুয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম আরিফ এবং অন্যান্য সহকর্মীরা ছুটে আসেন। তারা রক্তাক্ত লোকমানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
কিন্তু হৃদয়বিদারক সত্য এখানেই শেষ নয়। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি। কেন? কারণ, হামলাকারীরা হাসপাতালে ভাঙচুর করতে পারে—এমন এক অমানবিক আশঙ্কায় চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই বিদায় দেন। একজন সাংবাদিকের জীবনের মূল্য যেখানে তার নিরাপত্তার চেয়ে কম, সেখানে আমরা কোন সমাজে বাস করছি?
লোকমান মৃধা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু তার মনের ক্ষত হয়তো কোনোদিন শুকাবে না। এই ঘটনা সাংবাদিক সমাজের মধ্যে এক গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন—আমরা কি তবে সত্য প্রকাশের জন্য এমন মূল্য দিতে বাধ্য? তাদের দাবি, অবিলম্বে এই হামলাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে আর কোনো সাংবাদিককে এমন করুণ পরিণতির শিকার হতে না হয়।