ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫৩তম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ সভাপতির ভাষণ দিয়েছেন। শনিবার (১৯ নভেম্বর) ঢাবি ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজিত বর্ণাঢ্য সমাবর্তনে দেয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি নেতৃত্বেরও পথপ্রদর্শক। মুক্তিযোদ্ধাসহ বাঙালির প্রতিটি সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা।
প্রতিটি আন্দোলনের ‘নিউক্লিয়ার’ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কলা ভবনে প্রথম উত্তোলন করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনও ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের অর্থ সামাজিক উন্নয়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অবদান। জাতির পিতার শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা পর্যন্ত বহু নেতৃবৃন্দ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোকিত হয়েছেন। আলোকিত মানুষ হয়ে অনেকে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও রাখবেন বলে আশাবাদী।
তিনি সমবর্তনে আগতদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম-তখন শিক্ষকদের দেখলেই মাথা মত হয়ে আসতো। ইদানিং সে অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছুসংখ্যক উপাচার্য ও শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডে সমাজে শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আপনাদের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, কিছুসংখ্যক অসাধু লোকের কর্মকাণ্ডের জন্য গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা যেন ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একজন উপাচার্যের মূল দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক এবং একাডেমিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান, পরিচালন, মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন করা। ইদানিং পত্রিকা খুললেই মনে হয়, পরিবার-পরিজন ও অনুগতদের চাকরি দেয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেয়াই যেন কিছু উপাচার্যের মূল দায়িত্ব। আবার অনেক শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাকে ঐচ্ছিক দায়িত্ব মনে করেন। বৈকালিক কোর্স বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়াকেই তারা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছাত্র-শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে এটি খুবই বেমানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই কৃতি ও সেরা ছাত্র ছিলেন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমার বিশ্বাস- আপনারা যে কোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হতেন। কিন্তু জীবনের মহান ব্রত হিসাবে শিক্ষকতাকেই আপনারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাই শিক্ষক হিসাবে নিজ পেশার প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা। আমরা চাই উপাচার্যের নেতৃত্বে ও ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হোক। অর্থাৎ সেন্টার অব এক্সিল্যান্স হিসেবে গড়ে উঠুক। শিক্ষকগণ হয়ে উঠুন সমাজে মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকসহ যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো এক একটি গবেষণাগার। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো জ্ঞান চর্চার মাধ্যমেই সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ডকে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ নজরে দেখা হতো। অথচ সে ঐতিহ্য সংকুচিত হয়ে আসছে। ছাত্র-শিক্ষক এবং সুযোগ সুবিধা পর্যাপ্ত না হলেও অনেক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষার মান কতটুকু বেড়েছে বা কমেছে সেটার মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণা বিষয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয় তা দেখলে আমাকেও লজ্জা পেতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি আমার আহ্বান, গবেষণাগুলো তুলে ধরুন যাতে শিক্ষার্থীদের বিদেশ যেতে না হয়। বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রযুক্তি আর আধুনিকতায় অনেক এগিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কর্মঠ আর যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ। আশা করি, কিছুদিনের মধ্যেই ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগেও প্রায়-ই অভিযোগ শোনা যায় যে, ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সার্টিফিকেট উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে ছাত্র-ছাত্রীরা অবহেলা আর হয়রানির মুখোমুখি হন। আমি শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার, কাউন্সিলিং এন্ড সাপোর্ট সেন্টার, ক্যারিয়ার প্লানিং ইউনিট ইত্যাদি চালুর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। পাশাপাশি সেসন জট কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে লস রিকভারি প্ল্যান, গবেষণা মেলার আয়োজন, স্টুডেন্ট সাপোর্ট ইউনিট ইত্যাদি চালু করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকে আমি বসে বক্তব্য রাখার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত। আমি শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। তিনদিন আগে বিদেশে চিকিৎসা করে ফিরেছি। চিকিৎসা করলেও তেমন ভালো হয়ে আসতে পেরেছি তা নয়। এই কনভোকেশনে আসার মত অবস্থা আমার নেই, কিন্তু মনের জোরে এসেছি। আমি পূর্বেও বলেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা আমার ছিল না; অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হয়েছি আমি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় শেষ। গত তিন বছর করোনার জন্য আসা সম্ভব হয়নি। আমার জন্য এটাই হয়তো শেষ সমাবর্তন। তবে নাকের আগে দম থাকা পর্যন্ত আমি চেষ্টা করবো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার। সেজন্য শরীরের জোর না থাকলেও মনের জোরে এখানে এসেছি।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দুই মেয়াদ আমার শেষ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে আমার থেকে আরও জ্ঞানী-গুণী রাষ্ট্রপতি আপনারা পাবেন। তবে আমি আপনাদের কাছে এটুকুই বলতে চাই, যদিও এই ইউনিভার্সিটির ছাত্র আমি ছিলাম না তবে ৬০ দশকের প্রথম বা ৫০ দশকের শেষ থেকে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুসরণ করেই রাজনীতি করেছি, আন্দোলন সংগ্রাম করেছি এবং দেশ স্বাধীন করেছি। সুতরাং আমি চাই, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামীতেও তাদের নেতৃত্বের মাধ্যমে এই দেশকে আর উন্নত করবে। এটাই আমি আশা করি।
সমাবর্তন বক্তা নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. জ্যাঁ টিহলকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, আপনার উপস্থিতি তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের, মানবজাতি ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে সমৃদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ এবং উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামালও বক্তব্য দেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন সংসদ সদস্য, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, ঢাবির সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক, অতিথি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রী ও গবেষকগণ উপস্থিত ছিলেন।